প্রিন্ট এর তারিখঃ Sep 12, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jan 12, 2026 ইং
তথ্য গোপনে বাড়ছে অনিয়মের ঝুঁকি: কার্যকর হচ্ছে না তথ্য অধিকার আইন

মামুনুর রশীদ মামুন | বিশেষ প্রতিবেদকঃ
তথ্য অধিকার আইন,২০০৯—নামেই যার মর্মার্থ স্পষ্ট। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ,আর রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের তথ্য জানার অধিকার তাদের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। এই আইন প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসনে স্বচ্ছতা,জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আজও অধিকাংশ সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইট ও তথ্য বাতায়নে (Information Portal) প্রকাশযোগ্য তথ্য অনুপস্থিত, অসম্পূর্ণ কিংবা বছরের পর বছর ধরে হালনাগাদহীন। প্রশ্ন উঠছে—আইন কি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ?
আইন কী বলে তথ্য বাতায়ন নিয়ে তথ্য অধিকার
আইন,২০০৯ অনুযায়ী প্রতিটি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট কিছু তথ্য স্বপ্রণোদিতভাবে (Proactive Disclosure) প্রকাশ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে—দপ্তরের
সাংগঠনিক কাঠামো,দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নাম ও যোগাযোগ,বাজেট,বরাদ্দ ও ব্যয়ের বিবরণ–ক্রয়-বিক্রয় ও টেন্ডার সংক্রান্ত তথ্য
সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া,সেবা প্রদানের নিয়ম, সময় ও ফি–এই তথ্যগুলো জনগণের কাছে সহজে পৌঁছানোর জন্য ওয়েবসাইট ও তথ্য বাতায়নকে প্রধান মাধ্যম হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। তথ্য কমিশনও নিয়মিতভাবে এ বিষয়ে নির্দেশনা জারি করে আসছে। বাস্তবতা: তথ্য আছে,কিন্তু অদৃশ্য! মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় দেখা যায়—বহু সরকারি অফিসের ওয়েবসাইটে শেষ আপডেটের তারিখ কয়েক বছর আগের
বাজেট ও ব্যয়ের তথ্য নেই,কিংবা আংশিক
টেন্ডার নোটিশ প্রকাশ হয় দেরিতে,ফলাফল প্রকাশই হয় না! দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম থাকলেও যোগাযোগ নম্বর অচল! ফলে নাগরিকরা তথ্য জানতে বাধ্য হয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেন। কিন্তু সেখানেও শুরু হয় সময়ক্ষেপণ,অজুহাত আর নীরবতা। কেন এই অনীহা? বিশেষজ্ঞদের মতে,এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে—আইন না মানার সংস্কৃতি: অনেক দপ্তরই আইন মানাকে বাধ্যবাধকতা নয়, ‘ঐচ্ছিক’ হিসেবে দেখে। জবাবদিহির ভয়: তথ্য প্রকাশ মানেই প্রশ্নের মুখে পড়া—এই মানসিকতা।
প্রশাসনিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি: তথ্য কর্মকর্তা নিয়োগ থাকলেও দায়িত্ব ও আইনের স্পষ্ট ধারণা অনেকের নেই। তদারকির দুর্বলতা: আইন ভঙ্গের জন্য কার্যকর শাস্তির নজির কম। তথ্য গোপন মানেই কি সত্য আড়াল? তথ্য অধিকার কর্মীদের ভাষায়,তথ্য গোপন করা মানেই দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়ানো। কারণ যেখানে আলো নেই,সেখানেই অনিয়মের বিস্তার ঘটে। তথ্য প্রকাশ হলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে জনআলোচনা হয়,ভুল ধরিয়ে দেওয়া যায়,সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু তথ্য লুকালে প্রশ্ন ওঠে—কিসের ভয়? কাকে রক্ষা করা হচ্ছে? সরকারের হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ জরুরিঃ তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়ন শুধু তথ্য কমিশনের একক দায়িত্ব নয়। এটি একটি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যদি স্পষ্ট বার্তা না আসে—আইন মানতেই হবে—তবে মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন ঘটবে না। প্রয়োজন—নিয়মিত অডিট ও মনিটরিং
–তথ্য বাতায়ন হালনাগাদ না করলে প্রশাসনিক জবাবদিহি ও শাস্তি–তথ্য কর্মকর্তাদের কার্যকর প্রশিক্ষণ–নাগরিক অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি। তথ্য অধিকার আইন কোনো দয়ার দান নয়,এটি জনগণের অধিকার। তথ্য বাতায়ন কেবল একটি ওয়েবসাইট নয়—এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার বিশ্বাসের সেতু। সেই সেতু ভেঙে পড়লে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্রই। এখন প্রশ্ন একটাই—সরকার কি কেবল আইন প্রণয়নেই সন্তুষ্ট থাকবে,নাকি তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করবে? জনমনে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় এসেছে।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ Revolt News BD